সর্বশেষ
বিজ্ঞাপন

এখানে আপনার Google AdSense বা স্পনসর ব্যানার কোড (৭২৮x৯০ বা রেসপন্সিভ) বসান।

বিশ বছরের অপেক্ষার অবসান — ৯৪২ কোটি টাকার অত্যাধুনিক রাডার চালু হলো শাহজালালে



প্রতিদিন শত শত বিদেশি বিমান বাংলাদেশের আকাশের উপর দিয়ে উড়ে যায়মধ্যপ্রাচ্য থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ থেকে অস্ট্রেলিয়া। এই বিমানগুলো বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার করে, অথচ বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশ তাদের একটা বড় অংশকে ঠিকমতো শনাক্তই করতে পারত না। কারণ ছিল একটাইচল্লিশ বছরের পুরনো একটি রাডার, যার দৃষ্টিসীমা বঙ্গোপসাগরের গভীরে পৌঁছাত না।

সেই দৃষ্টিহীনতার অবসান ঘটল এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে।

গত ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়া নতুন এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সেন্টার (এটিএমসি) উদ্বোধন করা হয় এপ্রিলে। বেসামরিক বিমান পরিবহন পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সেই সাথে ছিলেন ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যাঁ-মার্ক সেরে-শার্লেযিনি বাংলাদেশ ফ্রান্সের এই সহযোগিতাকে পারস্পরিক আস্থা বন্ধুত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

কী আছে এই নতুন ব্যবস্থায়

এটি শুধু একটি নতুন রাডার নয়ফরাসি প্রতিষ্ঠান থ্যালেস সম্পূর্ণ নতুন একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা স্থাপন করেছে যার মধ্যে রয়েছে এটিসি অটোমেশন, প্রাইমারি সেকেন্ডারি রাডার, এডিএস-বি প্রযুক্তি, ওয়াইড এরিয়া মাল্টিলেটারেশন এবং সারাদেশে ভিএসএটি যোগাযোগ নেটওয়ার্ক। শাহজালাল বিমানবন্দরে নির্মিত ৪৫ মিটার উঁচু নতুন কন্ট্রোল টাওয়ারেই এই সব প্রযুক্তির কেন্দ্র।

এই ব্যবস্থায় রয়েছে ইন্টিগ্রেটেড ফ্লাইট ডেটা প্রসেসিং, রাডার এডিএস-বি সংযোজন এবং অ্যাডভান্সড সেফটি নেটযা রিয়েল-টাইম তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। সহজ ভাষায়, আগে যেখানে নিয়ন্ত্রকদের অনেকটা অনুমানের উপর নির্ভর করতে হতো, এখন প্রতিটি বিমানের গতিবিধি মুহূর্তে মুহূর্তে স্ক্রিনে ধরা পড়ছে।

নতুন রাডার ঢাকা থেকে ৩৫০ নটিক্যাল মাইল বা প্রায় ৬৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিমান শনাক্ত করতে পারে। এর ফলে বঙ্গোপসাগরের গভীরে বাংলাদেশের নতুন সামুদ্রিক সীমানার পুরোটাও এখন নজরদারির আওতায়।

যে ফাঁক দিয়ে বছরের পর বছর বেরিয়ে গেছে রাজস্ব

পুরনো রাডারের সীমাবদ্ধতা শুধু নিরাপত্তার প্রশ্ন ছিল না, এটি ছিল একটি বড় আর্থিক ক্ষতিও। বাংলাদেশের আকাশসীমার উপর দিয়ে যাওয়া বিদেশি বিমান থেকে বাধ্যতামূলক ওভারফ্লাইট চার্জ আদায় করা যাচ্ছিল না, কারণ পুরনো রাডার বিশেষত বঙ্গোপসাগরের উপরের সব বিমান শনাক্ত করতে পারত না।

সেই ক্ষতির পরিমাণটা স্পষ্ট হয় সংখ্যায়। গত কয়েক বছরে বেবিচকের বার্ষিক ওভারফ্লাইট আয় ছিল ,৫০০ থেকে ,৯০০ কোটি টাকার মধ্যে। নতুন রাডার পুরোদমে চালু হলে সেই আয় ,৫০০ থেকে ,০০০ কোটি টাকায় পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। অর্থাৎ কার্যত দ্বিগুণ।

এই সম্ভাবনার একটি বাস্তব নমুনা ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। সম্প্রতি ভারতীয় বিমান সংস্থা স্পাইসজেটকে বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহারে নিষেধ করা হয়েছে দীর্ঘদিনের বকেয়া ওভারফ্লাইট চার্জ পরিশোধ না করার কারণে। নতুন ব্যবস্থায় আকাশসীমার আকর্ষণীয়তা বাড়বে, ফ্লাইট বিলম্ব কমবে এবং ওভারফ্লাইট রাজস্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে বেবিচকের এটিএম সদস্য এয়ার কমোডর মো. নূর--আলম জানান।

বিশ বছরের যাত্রা

এই রাডারের গল্পটা শুধু প্রযুক্তির নয়, একটি দীর্ঘ প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রারও। পুরনো রাডার বদলানোর উদ্যোগ প্রথম নেওয়া হয়েছিল ২০০৫ সালে। পিপিপি মডেলে, তারপর টেন্ডারেবারবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা জটিলতায় আটকে যায়। পরে সরকার ফ্রান্সের সাথে সরাসরি জি-টু-জি চুক্তির পথে যায়। ২০২১ সালের অক্টোবরে থ্যালেসের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর হয় এবং ২০২৩ সালের নভেম্বরে রাডার স্থাপন সম্পন্ন হয়। ২০১৯ সালে পরিকল্পনা শুরু হয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সম্পূর্ণ কাজ শেষ হয়, মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৯৪২ কোটি টাকা।

বিশ বছরের অপেক্ষা, নানা বিতর্ক, একাধিক সরকারের আমল পেরিয়ে অবশেষে বাংলাদেশের আকাশে বসল সত্যিকারের চোখ।

আঞ্চলিক হাবের স্বপ্নকতটা বাস্তব?

মন্ত্রী আফরোজা খানম বলেছেন, শাহজালাল বিমানবন্দরকে একটি বৈশ্বিক এভিয়েশন হাবে রূপান্তরের কাজ সক্রিয়ভাবে এগিয়ে চলছে। বেবিচক চেয়ারম্যানও একাধিকবার বলেছেন, "আমরা এই অঞ্চলের হাব হতে চাই।"

লক্ষ্যটা উচ্চাভিলাষী, কিন্তু ভিত্তি তৈরি হচ্ছে। থ্যালেস শুধু ঢাকায় নয়, সারাদেশের আঞ্চলিক বিমানবন্দরগুলোতেও সরঞ্জাম স্থাপন করছে। চট্টগ্রামের রাডার আধুনিকায়নও চলছে। নতুন ব্যবস্থা কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, আঞ্চলিক বৈশ্বিক বিমান চলাচলেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে বেবিচকের শীর্ষ কর্মকর্তারা আশাবাদী।

একটি দেশের আকাশসীমা কতটা দক্ষভাবে পরিচালিত হয়, তার সরাসরি প্রভাব পড়ে সেখানে আসা আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সংখ্যায়, বিনিয়োগে এবং পর্যটনে। সেই বিচারে এই রাডার শুধু একটি প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়এটি বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের ভবিষ্যতের ভিত্তিপ্রস্তর।

তথ্যসূত্র: The Daily Star, bdnews24, Bangladesh Monitor, Daily Messenger, Business Post, Thales Group

মন্তব্যসমূহ

← আগের লেখা