২৮
ফেব্রুয়ারি ২০২৬, তেহরানের আকাশ থেকে আছড়ে পরছে মার্কিন ক্ষেপনাস্ত্র ও বোমা। এই হামলায়
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আছে মধ্যপ্রাচ্যের ক্যান্সার খ্যাত ইজরায়েল। তখনও কেউ হয়তো ভাবেনি,
এই সামরিক অভিযানের আঁচ এতোটা দূর পর্যন্ত পৌছাবে যে কোনো কোনো দেশে জরুরি অবস্থা জারি
হতে হবে। অতঃপর তেলের বাজারে আগুন। ঢাকার জ্বালানি তেলের পাম্প থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের
বন্দর—বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের রণাঙ্গনের সাথে যুক্ত।
হরমুজ
প্রণালী: বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ
পারস্য
উপসাগর থেকে বিশ্বের বাকি অংশে পৌঁছানোর একমাত্র সমুদ্রপথ হলো হরমুজ প্রণালী। এই প্রণালী
দিয়ে বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন হয়। এই যুদ্ধের প্রতিশোধ হিসেবে
এই জলপথ কার্যত বন্ধ করে দেয় ইরান। যার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে ধাক্কা লেগেছে
তা ইতিহাসে বিরল।
আন্তর্জাতিক
জ্বালানি সংস্থার প্রধান এই পরিস্থিতিকে "ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক জ্বালানি
নিরাপত্তা সংকট" হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যুদ্ধ শুরুর সাথে সাথেই জ্বালানি বাজারে
তীব্র অস্থিরতা দেখা দেয় এবং ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০ থেকে ১৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি
৮০-৮২ ডলারে পৌঁছায়। এরপর থেকে দাম আরও ওঠানামা করছে।
বিশ্ব
অর্থনৈতিক ফোরামের বিশ্লেষণ বলছে, এটি কেবল একটি আঞ্চলিক সংকট নয় — এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির
জন্য একটি কাঠামোগত ধাক্কা, যা এসেছে অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার এক কঠিন মুহূর্তে।
এশিয়ার
উপর আঘাত — বাংলাদেশ সবচেয়ে ঝুঁকিতে
মধ্যপ্রাচ্যের
তেল ও গ্যাসের সবচেয়ে বড় ক্রেতা এশিয়ার দেশগুলো। এশিয়ার প্রায় ৮০ শতাংশ তেল আমদানি
হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে। ফলে এই অঞ্চলের দেশগুলো সংকটের কেন্দ্রে পড়েছে। তবে সবচেয়ে
বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে যে দেশগুলো, বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশ তার মোট জ্বালানি
চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানির উপর নির্ভরশীল। সরকার জ্বালানি ব্যবহারে সীমা আরোপ
করেছে, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রেখেছে এবং তেল মজুদদারি ঠেকাতে জ্বালানি ডিপোতে সেনা মোতায়েন
করেছে। বিকল্প সরবরাহের জন্য চীন ও ভারতের দিকে ঝুঁকছে ঢাকা। বাংলাদেশকে মূল্যমানের
দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল অর্থনীতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং এই যুদ্ধ দেশটির
জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে মন্দার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ব্যবসায়িক
প্রভাব: কোন খাত কতটা ক্ষতিগ্রস্ত
ঢাকা
থেকে তেহরানের দূরত্ব প্রায় চার হাজার কিলোমিটার। কিন্তু অর্থনীতিবিদ জাহিদ হুসাইন
এই যুদ্ধের প্রভাবকে ঝড়ের সাথে তুলনা না করে ভূমিকম্পের সাথে তুলনা করেছেন। ঝড় সাময়িকভাবে
আসে এবং চলে যায়। ভূমিকম্পের ক্ষত থেকে যায়।
ইরান
যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশে পৌঁছাচ্ছে জ্বালানি, সার, মালবাহী পরিবহন খরচ এবং বৈদেশিক
মুদ্রার প্রাপ্যতার মাধ্যমে। বাংলাদেশ তার মোট জ্বালানি চাহিদার বিশাল অংশ আমদানির
উপর নির্ভর করে। জ্বালানি অপচয় ও মজুদদারি ঠেকাতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন
যানবাহনভেদে জ্বালানি ভরার সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আগাম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং শপিং মল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান
রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের
তৈরি পোশাক খাত দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি। এই খাত ইতিমধ্যেই চাপে ছিল
— ইউরোপীয় ইউনিয়নে পোশাক রপ্তানি ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আগের বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশের
বেশি কমে গেছে। যুদ্ধ শুরুর পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ায়
মার্সক, হ্যাপাগ-লয়েড ও সিএমএ সিজিএমের মতো বড় শিপিং কোম্পানিগুলো অঞ্চলটিতে কার্যক্রম
স্থগিত করেছে। যুদ্ধ-ঝুঁকি বিমার প্রিমিয়াম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। দ্রুততা ও নির্ভরযোগ্যতার
উপর দাঁড়িয়ে থাকা এই শিল্পের জন্য এই ধাক্কা সামলানো কঠিন।
প্রতি
বছর বাংলাদেশে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স আসে, যার বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত
৭০ লাখেরও বেশি শ্রমিকের পাঠানো অর্থ। উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা ও অনিশ্চয়তার কারণে
নির্মাণ, পরিষেবা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার প্রবাসী কর্মী
কাজ হারিয়েছেন। এই খাতে ধাক্কা লাগলে তার প্রভাব সরাসরি পড়বে গ্রামীণ পরিবারগুলোর
আয়ে।
বিশ্ববাজারে
অনিশ্চয়তা — কতদিন চলবে?
মার্কিন
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন পর্যন্ত যুদ্ধ শেষের কোনো সময়সীমা দিতে রাজি হননি। যুদ্ধবিরতি
ঘোষণা হলেও তা বারবার ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে। হরমুজ প্রণালীতে ইরানের সামরিক সক্ষমতা লক্ষ্য
করে নতুন পরিকল্পনা তৈরি করছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। অর্থাৎ সংকট আরও দীর্ঘস্থায়ী
হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
বিশ্ব
অর্থনৈতিক ফোরাম বলছে, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, ক্ষতিও তত স্থায়ী হবে। প্রথমে ধাক্কা আসে
জ্বালানি ও শিপিংয়ে, তারপর মূল্যস্ফীতি ও শিল্প খরচে, এবং শেষ পর্যন্ত বাণিজ্য রুট,
বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায়।
যা
বলছে গবেষণা
সাউথ
এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর একটি সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, যুদ্ধ
দীর্ঘস্থায়ী হলে আগামী দুই বছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে
যেতে পারে। পরিবহন ও লজিস্টিক্স খাতে ক্ষতি হতে পারে ৫ শতাংশ পর্যন্ত, পোশাক খাতে সাড়ে
৪ শতাংশ এবং কৃষিতে দেড় শতাংশ।
গবেষণার
প্রধান অধ্যাপক সেলিম রাইহান বলেছেন, "একসাথে একাধিক চাপ এলে এগুলো একে অপরকে
আরও শক্তিশালী করে। জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়ে। বাণিজ্য বিঘ্নিত হলে রপ্তানি
চাহিদা কমে। আর রেমিট্যান্স কমলে পরিবারের আয় ও ভোগব্যয় দুটোই কমে।"
সংকটের
মধ্যেও পথ আছে
পরিস্থিতি
কঠিন — কিন্তু নিরুপায় নয়। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এখনই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ
বাড়ানো, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করা এবং রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্যময় করার
উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু সরকার নয়, উদ্যোক্তাদেরও এই মুহূর্তে কৌশলী হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
যেসব
ব্যবসা এখন জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করবে, যারা সরবরাহকারী বৈচিত্র্য
আনবে এবং যারা মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে নতুন বাজার খুঁজবে — সংকট কেটে গেলে তারাই এগিয়ে
থাকবে। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, বৈশ্বিক সংকটের পর নতুন বিন্যাসে যারা আগে থেকে প্রস্তুত
থাকে, নতুন সুযোগটা তাদেরই হাতে ধরা দেয়।
তথ্যসূত্র:
The Daily Star, Anadolu Agency, SANEM, World Economic Forum, TIME

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন